এক সময়ে বাংলার প্রবেশদ্বার বলে পরিচিত গোয়ালন্দ মহকুমার সদর দপ্তর এখন রাজবাড়ী জেলা হিসেবে পরিচিত। ভৌগলিক ভাবে এটি ২৩০৩৫′ উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২৩০৫৫′ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯০০৯′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে থেকে ৮৯০৫৫′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত যার আয়তন মাত্র ১১১৮.৮ বর্গ কি:মি: ।বাস্তবিক অর্থেই জেলাটি নদীমাতৃক ।প্রধান নদী পদ্মা হলেও জেলার চারপাশ ঘিরে রয়েছে অনেক নদী ও বিল।৫টি উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজবাড়ী। পরিসংখ্যান এর খাতে এই জেলার জনসংখ্যা প্রতি বর্গ কিলোমিটারএ ৪০০০জন সত্যিকার অর্থে আরো অনেক বেশি। এই এলাকার শাসক রাজা সূর্য কুমার গুহ রায় এর নামানুসারে জেলাটির নামকরণ করা হয়।
এটি বাংলাদেশের প্রায় মধ্যভাগে অবস্থিত এবং ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত...একসময়ে এই জেলা বৃহত্তর ফরিদপুরের মধ্যে থাকলেও পরে এটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে পরিচিতি পায়.রাজবাড়ী পৌরসভা স্থাপিত হয় ১৯২৩ সালে। পদ্মা বিধৌত রাজবাড়ী.. মূলত কৃষি কাজের জন্য বিখ্যাত.. রাজবাড়ীর উত্তরে ফরিদপুর,মাগুরা দক্ষিনে ,মানিকগঞ্জ পূর্বে এবং পশ্চিমে কুষ্টিয়া আর ঝিনাইদহ। এই জেলায় পদ্মা ছাড়াও আরো ৫টি শাখা নদী আছে ….জলাঙ্গী, কুমার, গড়াই-মধুমতি, হরাই এবং চন্দনা।. খনন না করায় সবগুলি এখন মৃতপ্রায় ।বিখ্যাত কল্যান দিঘিও এখানেই অবস্থিত ।মানিক বন্দোপাধ্যায় এর পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের পটভূমিও রাজবাড়ি ..... উপন্যাসে বর্ণিত আমিন বাড়ী , কেতুপুর এখন গোয়ালন্দ ঘাট হিসেবে সবাই চেনে.....এখানে এলেই উপন্যাসের চরিত্রগুলো চোখের সামনে জীবন্ত হে উঠবে .......প্রায় ১০০ বছর পেরিয়ে গেলেও এই এলাকার কুবেরদের ভাগ্য ফেরেনি..... আজ গরীবের মধ্যে তারা গরীব , ছোটলোকের মধ্যে ছোটলোক.. তবে এখন মা দূর্গা তাদের ঘরে পূজা নিতে আসেন ....... এখন প্রতি বছর সরম্বরেই এখানে দূর্গা পূজা হয়........
| rabari rail station |
রেল এর পাশাপাশি নৌ পথে যাতায়াত করার জন্য এই এলাকা প্রসিদ্ধ ছিল । ..এমনকি স্টিমার ও বজরা সহযোগে ঢাকা -কলকাতা যাতায়াত ছিল। এই নৌপথেই ১৯১৩ সালে রাজবাড়ীতে আগমন ঘটেছে রবীন্দ্রনাথ এর। তারাশঙ্কর, অবধূতের মত সাহিত্যিকেরও নিয়মিত যাতায়াত ছিল,রাজবাড়ীর হরিধারাতে এসে মরুতীর্থ হিংলাজ লেখেন অবধূত। এখানে বঙ্গাব্দ ১৩২৪ এ সুভাষ চন্দ্রবসু স্বদেশী আন্দোলনের বক্তৃতা রাখেন, সেই জায়গাটি এখন আজাদী ময়দান বলে পরিচিত।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এই এলাকার মানুষ সরাসরি অংশগ্রহণ করেছে ..১৯৭১ এ ২৫ মার্চ গণহত্যার পরপরই এখানে ড: এ কে এম আমজাদ , ড: এস এ মালেক এবং রফিক উদদীন এর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়.. চারিদিকে নদীপথ থাকায় এটি মুক্তি যোদ্ধাদের জন্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুপ্তপথ হযে ওঠে।
যদিও রাজবাড়ী খুব ছোট একটা মফস্স্বল ..কৃষিপ্রধান অঞ্চল .. এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর।
এই এলাকা ধান ,পাট, সরিষা ও আখ চাষের উপযোগী । রাজবাড়ির নাম শুনলেই যে কথাটা সবার আগে মনে আসে সেটা হলো ইলিশ মাছ আর চমচম
, এছাড়াও এখানকার আখ ও তরমুজ ও খুব নামকরা।
এ এলাকার মানুষজন খুব অতিথিপরায়ন ও নিরীহ
প্রকৃতির..শ্রেণী বৈষম্য প্রায় নেই বললেই চলে।যে কোনো পার্বনেই সবাই সমান ভাবে যোগ দেয় ।অন্যান্য জায়গার মত পয়লা বৈশাখ ,ঈদ ,দুর্গাপূজার পাশাপাশি রাজবাড়ী শহরের একটা নিজস্ব উত্সব আছে সেটা হলো বই উত্সব ..সাধারণত স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা করে থাকে । এই জেলায় সাক্ষরতার হার খুব বেশি না ৩০% ।এখানে কলেজ ২৪টি , মাদ্রাসা ৫৬টি,উচ্চবিদ্যালয় ৯৩টি,প্রাথমিক বিদ্যালয় ৪০৮ , community school ৯টি ,
satellite school ১৩টি , vocational training institution ৪টি . এর মধ্যে রাজবাড়ি সরকারী কলেজ (১৯৬১), পাংশা কলেজ (১৯৬৯), বালিয়াকান্দি উচ্চবিদ্যালয় (১৯১৭) সালে স্থাপিত। রাজবাড়ী থেকে নিয়মিত কয়েকটি পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা বের হয় যথা matrikontho, গতকাল , পাংশা বার্তা , পদ্মা বার্তা , অনুসন্ধান (রাজবাড়ী , ১৯৮৪), সহজ কথা, ও রাজবাড়ী কন্ঠ; এবং অধুনালুপ্ত কহিনুর (১৮৯৮), খাতক (১৮৯৩), কাঙ্গাল (১৯০৫), শাপলা-শালুক।
.. সে অর্থে রাজবাড়ী কোনো ঐতিহাসিক জায়গা নয় ... যেটুকু আছে আমাদের অজ্ঞতা এবং অবহেলায় তাও আজ ধংসের পথে ।তবুও তার ভেতর দেখার মত কয়েকটা জায়গা তুলে ধরছি ..
শাহ পাহলোয়ানের মাজারঃ রাজবাড়ী অঞ্চলে ষোড়শ শতকে ধর্ম প্রচারের জন্য আসেন শাহ পাহলোয়ান এর মত আউলিয়ারা। ১৪৮০ হতে ১৫১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শাহ পাহলোয়ান বোগদাদ শরীফ ছেড়ে ফরিদপুর অঞ্চলে এসে চন্দনা নদীর তীরে বসবাস শুরু করেছিলেন। শোনা যায় শাহ পাহলোয়ান মৃত্যুর সময় শিষ্যদের তার কবর পূর্ব-পশ্চিম লম্বা-লম্বি দিতে বলেছিলেন। কিন্তু তার শিষ্যগণ প্রচলিত বিধানমতে যথানিয়মে তাকে কবরস্থ করেন। পরদিন সকালে দেখা যায় তার কবর ঘুরে পূর্ব-পশ্চিম লম্বা-লম্বি হয়ে গিয়েছে। শাহ পাহলোয়ানই রাজবাড়ী অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের ভিত রচনা করে গেছেন।
![]() |
| making of 'CHOMCHOM' |
এই এলাকা ধান ,পাট, সরিষা ও আখ চাষের উপযোগী । রাজবাড়ির নাম শুনলেই যে কথাটা সবার আগে মনে আসে সেটা হলো ইলিশ মাছ আর চমচম
, এছাড়াও এখানকার আখ ও তরমুজ ও খুব নামকরা।
এ এলাকার মানুষজন খুব অতিথিপরায়ন ও নিরীহ
প্রকৃতির..শ্রেণী বৈষম্য প্রায় নেই বললেই চলে।যে কোনো পার্বনেই সবাই সমান ভাবে যোগ দেয় ।অন্যান্য জায়গার মত পয়লা বৈশাখ ,ঈদ ,দুর্গাপূজার পাশাপাশি রাজবাড়ী শহরের একটা নিজস্ব উত্সব আছে সেটা হলো বই উত্সব ..সাধারণত স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা করে থাকে । এই জেলায় সাক্ষরতার হার খুব বেশি না ৩০% ।এখানে কলেজ ২৪টি , মাদ্রাসা ৫৬টি,উচ্চবিদ্যালয় ৯৩টি,প্রাথমিক বিদ্যালয় ৪০৮ , community school ৯টি ,
| Rajbari Girls high school |
![]() |
| Rajbari Govt' boys high school |
.. সে অর্থে রাজবাড়ী কোনো ঐতিহাসিক জায়গা নয় ... যেটুকু আছে আমাদের অজ্ঞতা এবং অবহেলায় তাও আজ ধংসের পথে ।তবুও তার ভেতর দেখার মত কয়েকটা জায়গা তুলে ধরছি ..
শাহ পাহলোয়ানের মাজারঃ রাজবাড়ী অঞ্চলে ষোড়শ শতকে ধর্ম প্রচারের জন্য আসেন শাহ পাহলোয়ান এর মত আউলিয়ারা। ১৪৮০ হতে ১৫১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শাহ পাহলোয়ান বোগদাদ শরীফ ছেড়ে ফরিদপুর অঞ্চলে এসে চন্দনা নদীর তীরে বসবাস শুরু করেছিলেন। শোনা যায় শাহ পাহলোয়ান মৃত্যুর সময় শিষ্যদের তার কবর পূর্ব-পশ্চিম লম্বা-লম্বি দিতে বলেছিলেন। কিন্তু তার শিষ্যগণ প্রচলিত বিধানমতে যথানিয়মে তাকে কবরস্থ করেন। পরদিন সকালে দেখা যায় তার কবর ঘুরে পূর্ব-পশ্চিম লম্বা-লম্বি হয়ে গিয়েছে। শাহ পাহলোয়ানই রাজবাড়ী অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের ভিত রচনা করে গেছেন।
| Shahid smriti stombho...Rajbari |
দাদশি মাজার শরীফঃ রাজবাড়ী শহর থেকে রেল লাইন ধরে কিছুদূরেই দাদ্শী খোদাই দরগা। ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে কামাল শাহ নামক এক আউলিয়া ষোড়শ শতকে এতদঞ্চলে আগমন করেন। ১৮৯০ সালে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত রাজবাড়ী রেল লাইন স্থাপনের সময় জঙ্গলের মধ্যে দরগাটির সন্ধান পাব যায়।
নলিয়া জোড় বাংলা মন্দিরঃ বালিয়াকান্দি থানার নলিয়া গ্রামে একটি জোড় বাংলা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। মন্দিরটি ১৭০০ সালে তৈরী ।
মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি কেন্দ্রঃ মহাকাব্য বিষাদ সিন্ধু এর লেখক মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি বিজড়িত পৈত্রিক নিবাস পদমদীতে মীর মশাররফ হোসেন ও তার স্ত্রীর সমাধিকে ঘিরে ১৯৯৯ সালে তৈরী করা হয় মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি কেন্দ্র।
সমাধিনগর মঠ ( অনাদি আশ্রম): বালিয়াকান্দি উপজেলার জঙ্গল ইউনিয়নে ১৯৪০ সালে স্বামী সমাধী প্রকাশরণ্য এ মঠটি নির্মাণ করেন যার উচ্চতা ৭০ ফুট (গম্বুজসহ), দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ ফুট এবং প্রস্থ ৫০ ফুট। এটি অনাদি আশ্রম বলে পরিচিত।
রথখোলা স্নানমঞ্চঃ রাজবাড়ী শহর থেকে দুই স্টেশন পশ্চিমে প্রাচীন হড়াই নদীর তীরে বেলগাছির কাছে হাড়োয়ায় স্থাপিত হয়েছে কষ্টি পাথরের মদন মোহন জিউরমন্দির । সবাই বলেন মদন মোহন এর মূর্তিটি পাল আমলের। বেলগাছিতে রাম জীবনের নামে গড়ে ওঠে আখড়া। রাম জীবনের স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে সেখানে স্নানমঞ্চ ও দোলমঞ্চের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে।
নীলকুঠিঃরাজবাড়ী সেসময় মূলত নীল বিদ্রোহের কারণেই লোকমুখে পরিচিতি পায় । ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর নীলকরদের অত্যাচার আরো বৃদ্ধি পায় এবং প্রজা সাধারণ অতিষ্ট হয়ে নীলকরদের বিরূদ্ধে রুখে দাড়ায়। শুরু হয় নীলবিদ্রোহ। রাজবাড়ীতেও নীলবিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এ সময় বালিয়াকান্দি থানার সোনাপুরের হাশেম আলীর নেতৃত্বে শত শত চাষী নীলকর ও জমিদারদের বিরূদ্ধে নীল বিদ্রোহে অংশ নেয়। বহু স্থানে নীলকুঠি আক্রমণ করে ও কাচারী জ্বালিয়ে দেয়। এ অঞ্চলের বসন্তপুর, বহরপুর, সোনাপুর, বালিয়াকান্দি, নাড়ুয়া, মৃগী, মদাপুর, সংগ্রামপুর, পাংশার নীলচাষীরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ফলে ১৮৬০ সালে বৃটিশ সরকার নীল কমিশন বসান এবং নীল চাষ স্বেচ্ছাধীন ঘোষণা করেন।
এই এলাকাটি সুবেদার শাসিত ছিল .. তাই তাদের বিলাসিতা ও অত্যাচার দুয়েরই নিদর্শন আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।যদিও আমাদের অবহেলায় তার অনেকগুলোই আজ আর নেই .........
রাজবাড়ীর ভেতরেই বাগদি সম্প্রদায়ের বসবাস আছে ..কথিত আছে ব্রিটিশ শাসনামলে এই সম্প্রদায়ের একটি মেয়েকে এক সাহেব বিয়ে করতে চেয়েছিলেন কিন্তু সমাজের কেউ মেনে নেয়নি .. মেয়েটি হত্যা করে সাহেব তাকে পুরো বিয়ের সাজে সাজিয়ে সমাধি দেন এবং তিনি রাজবাড়ী ছেড়ে চলে যান .. সে সমাধি আজও আছে .......
দৌলতদিয়া ঘাট/পাটুরিয়া ঘাট: বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, বরিশাল পদ্মা নদী দ্বারা বিভক্ত। ঢাকা হতে দক্ষিণাঞ্চলে এসব জেলায় পৌছাতে হলে দৌলতদিয়া ঘাট অতিক্রম করা অপরিহার্য। ব্রিটিশ ভারতে গোয়ালন্দ বাংলার পশ্চিম আর পূর্বের সেতু বন্ধন হিসেবে বাংলার দ্বার নামে পরিচিত ছিল। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সাথে রাজধানী ঢাকার সেতুবন্ধন হিসেবে দৌলতদিয়া ঘাট গুরুত্বপূর্ণ ।এখানেই যমুনা নদী পদ্মায় এসে মিলেছে ।
এ দেশের কয়েকজন বিখ্যাত মানুষের জন্মস্থান রাজবাড়ী। তারা হলেন ---
মীর মশাররফ হোসেন ছাড়াও মৌলবী তমিজুদ্দিন খান (speaker of Pakistan's Constituent Assembly), ইয়াকুব আলী চৌধুরী , বিখ্যাত
কার্টুনিস্ট রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই , বিজ্ঞানী কাজী মোতাহার হোসেন , অস্কার বিজেতা নাফীস বিন জাফর ।
কার্টুনিস্ট রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই , বিজ্ঞানী কাজী মোতাহার হোসেন , অস্কার বিজেতা নাফীস বিন জাফর ।




